বুধবার   ফেব্রুয়ারী ৪ ২০২৬   ২২  মাঘ  ১৪৩২


সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জনবল নিয়োগে 'সাউদিয়া সিকিউরিটি সার্ভিসেস' নামক আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টি স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট মহলে বেশ আলোচিত। ​আপনার জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে এই অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো: ​১. বেতন থেকে অবৈধভাবে টাকা কর্তন ​আউটসোর্সিং কর্মীদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো তাদের প্রাপ্য বেতন থেকে বড় একটি অংশ কোম্পানি কেটে নেয়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কর্মীদের যে বেতন দেওয়ার কথা, কোম্পানিটি তার চেয়ে অনেক কম টাকা কর্মীদের হাতে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে চেক বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পুরো টাকা দেখালেও পরবর্তীতে কর্মীদের কাছ থেকে নগদ টাকা ফেরত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ​২. নিয়োগ বাণিজ্য ও ঘুষ গ্রহণ ​সাউদিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে যে, তারা ক্লিনার, আয়া বা ওয়ার্ড বয় পদে নিয়োগ দেওয়ার সময় মাথাপিছু বড় অংকের টাকা (১ থেকে ৩ লাখ পর্যন্ত) ঘুষ গ্রহণ করে। সাধারণ ও দরিদ্র মানুষ সরকারি কাজের আশায় এই টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। ​৩. কর্মীদের অধিকার লঙ্ঘন ও হয়রানি ​ছুটি না দেওয়া: আউটসোর্সিং কর্মীদের সাপ্তাহিক ছুটি বা সরকারি ছুটি ঠিকমতো দেওয়া হয় না। ​ছাঁটাইয়ের ভয়: কোনো কর্মী দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুললে বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের প্রতিবাদ করলে তাকে তাৎক্ষণিক কাজ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ​পরিচয়পত্র ও চুক্তিপত্র: অনেক কর্মীকে নিয়োগের কোনো বৈধ চুক্তিপত্র বা যথাযথ পরিচয়পত্র প্রদান করা হয় না, যাতে তারা আইনি প্রতিকার না পেতে পারে। ​৪. ভুয়া কর্মী দেখিয়ে বিল উত্তোলন ​অভিযোগ রয়েছে যে, হাসপাতালে কর্মরত কর্মীর সংখ্যার চেয়ে কাগজে-কলমে বেশি কর্মী দেখিয়ে সাউদিয়া কোম্পানি সরকারের কাছ থেকে ভুয়া বিল উত্তোলন করে। হাসপাতালের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ আছে। ​সাম্প্রতিক অবস্থা ও ব্যবস্থা ​এই অনিয়মগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ওসমানী হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক এবং নার্সদের সাথেও আউটসোর্সিং কর্মীদের দ্বন্দ্ব হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়িয়েছে। মাঝেমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সিন্ডিকেটের প্রভাবে অনেক সময় মূল হোতারা অধরাই থেকে যায়। তদন্ত কমিটি গঠন ও অনিয়মের প্রমাণ ​হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি হাসপাতাল প্রশাসন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পৃথক তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে: ​ভুয়া মাস্টাররোল: প্রায়ই ১০০-১৫০ জন কর্মীর ভুয়া হাজিরা দেখিয়ে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হতো। ​ব্যাংক কার্ড জালিয়াতি: কর্মীদের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও চেকবই এবং এটিএম কার্ড থাকতো সাউদিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের কাছে। তারা নিজেরাই টাকা তুলে কর্মীদের হাতে সামান্য কিছু ধরিয়ে দিত। ​২. সাউদিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ​দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এবং কর্মীদের বেতন আত্মসাতের কারণে সাউদিয়া সিকিউরিটি সার্ভিসেসের কার্যাদেশ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ​সিলেটের সিভিল সার্জন এবং হাসপাতাল পরিচালক ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে কোম্পানির বিরুদ্ধে লিখিত প্রতিবেদন দিয়েছেন। ​কোম্পানিটির মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও জানা গেছে। ​৩. কর্মীদের বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি ​সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওসমানী মেডিকেলের আউটসোর্সিং কর্মীরা কয়েক দফায় হাসপাতালের সামনের রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। তাদের মূল দাবি ছিল: ​সাউদিয়া কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করা। ​বকেয়া বেতন সরাসরি কর্মীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিশ্চিত করা। ​নিয়োগ বাণিজ্যের সাথে জড়িত হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট সদস্যদের অপসারণ। ​৪. সিন্ডিকেট সদস্যদের পরিচয় প্রকাশ ​তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই অনিয়মের সাথে হাসপাতালের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং কর্মচারী ইউনিয়নের প্রভাবশালী নেতারা সরাসরি জড়িত ছিলেন। যারা সাউদিয়া কোম্পানির কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে মোটা অংকের কমিশন নিতেন। বর্তমান প্রশাসন এই চক্রটিকে ভাঙার চেষ্টা করছে। ​বর্তমান অবস্থা ​বর্তমানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন করে জনবল নিয়োগের জন্য স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অবলম্বনের চেষ্টা করছে। সাউদিয়া কোম্পানির প্রভাব কমানোর জন্য সরাসরি সরকারি তদারকিতে বেতন দেওয়ার দাবিটি জোরালোভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

MD SAD MIAH

Updated 26-Jan-21 /   |   সিলেট সদর (সিলেট) উপজেলা প্রতিনিধি   Read : 43